যদি বৃষ্টি নামে।। পর্ব: ৩.
তোমার নাম কি?
আমি কথা।
কোথায় থাকো?
আমি সাহেব বাঁধের কাছাকাছি থাকি।
ওই যে কাজ করছেন উনি কে হোন?
আমার বাপ। জালাল আলি। বাপের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছি।
ও।
নিবিড় তাকিয়ে থাকে কথার দিকে। মুখটাতে কেমন এক মায়া জড়ানো। মিষ্টি দেখতে। কথায় কোনো জড়তা নেই। হরিণখেতে নতুন প্রজেক্ট এর কাজ শুরু হয়েছে। তাজনূর ওকেই সব দায়িত্ব দিয়েছে। ও মন দিয়ে কাজ করছে। একা একা আর ভালো লাগে না। কেউ এলেই তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। যেমন আজ কথাকে পেয়ে নানান কথার জাল বুনতে ইচ্ছে করছে। নতুন সব ঘর উঠছে। ফাঁকা জায়গাটা ভরাট হয়ে যাবে আর কিছুদিন পরেই। নদীটা আর তেমন ভাবে দেখা যাবে না। তাজনূর ফোনে সব খোঁজ নেয়। মিলন কখনো সখনো ফোন করে। নিবিড় মিলনের ওপর রেগে আছে। এমন কাজ সে চায়নি। কিন্তু তাকে ছাড়া এ কাজ নাকি হবে না। এটা কোনো কথা হল? আসলে তেমন লোক পায়নি বলেই হয়তো তাকে দায়িত্ব দিয়েছে।
কথা, তুমি পড়াশোনা করো না?
করতাম। এখন আর করি না। কলেজ অবধি গেছি। কিন্তু পড়া শেষ করতে পারিনি। আসলে বাপটার হঠাৎই অসুখ হওয়ায় আর হল না কিছু।
নিবিড় অবাক হয়ে শুনছিল।
আসি স্যার।
যাবে?
আবার দেখা হবে।
বলেই কথা চলে যায় নদীর পাড় ধরে। নিবিড় তাকিয়ে থাকে। কথার শাড়ির আঁচল উড়ছে পতপত করে। শাড়ির খসখস শব্দ বাতাসে। যেন ছোট্ট একটা প্রজাপ্রতি। কথা এক সময় নদীর বাঁকে মিলিয়ে গেল। আরও কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কথা আর তাকে সময় দিল না। আগ বাড়িয়ে কথা বলা কি সে পছন্দ করেনি?
নিবিড় ভাবে।
এমন সময় লালু এলো ওর দুপুরের খাবার নিয়ে। লালু ওর সঙ্গে থাকে। এখানে কাছাকাছি একটা হোটেল আছে রোডের ওপর। ওই হোটেল থেকে খাবার এনে খায়। এখানে রান্না করে খাওয়া তার হবে না। এ সব তার ভালো লাগে না।
নিবিড়দা, খেয়ে নিন। লালু বলে।
তুই খেয়ে নে। আমি একটু দেখি কেমন সব চলছে।
আরে আগে খেয়ে নিন। পেট খালি থাকলে কি সব ভালো লাগবে?
তুই খুব পেট কাঁদা লালু।
লালু এ কথা শুনে হি হি করে হাসতে থাকে।
কি যে বলেন ভাই?
কেন? তুই খা।
আরে দেখনা আজ কি এনেছি?
কি?
তোমার পছন্দ হাড়িয়া কাবাব। দারুণ খুশবু। এসো এসো খাই।
নিবিড় এসে বসে তাঁবুর নিচে। নদী থেকে শীতল বাতাস আসছে। লালু এগিয়ে দেয় ভাতের থালা। নিবিড় হাত মুখ ধুয়ে নেয়। তারপর ও খাবার খেতে থাকে। লালুর বেশ পছন্দ আছে। তার বস কিসে খুশি হবে তা ও বেশ রপ্ত করেছে। তাজনূরই ওকে পাঠিয়েছে। অবশ্য লালু আছে বলেই ও এখানে সেখানে চলে যায়। একা একা ঘুরে বেড়ায়। গাছ দেখে। নদী। ফুল। হরিণখেতের মানুষজন। সাহেব বাঁধ দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে যায়। ধান জমি। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। সকালটা কী দারুণ কাটে। মনে মনে মিলনকে ধন্যবাদ জানায়। তাজনূর এখানে আর আসেনি। কাজ বুঝিয়ে দিয়েছিল ওকে। অফিসের লোকজন আসে। কথা হয়। তাজনূর রাতে ফোনে কথা বলে। মেয়েটি খুব হিসেবি। অবশ্য সেটা ভালো। না হলে এত বড়ো অফিস। লোকজন। সব দিক তাকে দেখতে হয়। মিলন কখনো কখনো অফিসে আসে। ওদের মধ্যে কি সব কথা হয়! নিবিড় তা জানে না। নিবিড় মাঝে মাঝে গিয়ে সব অফিসে জানিয়ে আসে। লেবারদের টাকা। আর যা যা লাগে সবই নিয়ে আসতে হয় ওকে। গাড়ি দেয় অফিস থেকে। নিবিড়কে আগাম ৫০০০০ টাকা দিয়েছিল তাজনূর। নিবিড় বেশ অবাক হয়েছিল টাকা পেয়ে। ও বলে, এত টাকা কি হবে?
বোকার মতো ও বলে।
আরে নিবিড়দা, তোমার দরকার পড়বে। রাখো এ গুলো। আরও লাগলে বলবে। তুমি অত কি ভাবছো? নাও।
তাজনূর বলে, সবে তো এলাম কাজে। আর--
ওটা আমি ভাববো।
নিবিড় আর কথা বাড়ায় না। তাজনূর এর রুম থেকে বেরিয়ে আসে। নিবিড় এত গুলো টাকা কখনো এক সঙ্গে দেখেনি। তার বাপ রেহান সেখ অনেক কষ্টে ওকে পড়া লেখা শিখিয়েছে। আজ প্রথম তার রোজগার। নিবিড় এর চোখে জল চলে আসে। তারও জীবনের একটা মানে আছে। তারও বাঁচার একটা জগৎ আছে। হঠাৎই জগৎটা সুন্দর হয়ে উঠছে তার কাছে।
লালু কাবাব খাচ্ছে। ও বেশ আনন্দে আছে। নিবিড় তাকে তেমন হুকুম করে না। লালুই আগাম সব করে রাখে। নিবিড় খেয়ে নেয়। কাজ চলছে। বিকেলে ছুটি হবে। আজ রোদ নেই। বেশ ছায়া। নিবিড় কাজ গুলো একবার দেখে নিল। তারপর ও লালুকে বলে বেরিয়ে আসে সাইট থেকে। নদীর কাছে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দেয়। মাঝে মাঝে এক আধটা খায় ও। তেমন নেশা নেই। সাহেব বাঁধটা চলে গেছে অনেক দূর। নদীর বাঁকে হারিয়ে গেছে। কথা কাছাকাছি কোথাও থাকে। ও এখন একটা গাঁয়ের পাঠশালায় পড়ায়। বেসরকারি। বাঁধের গায়ে পাঠশালা। একবার গেলে হয়। ভাবে নিবিড়। এমন সময় রিনরিন করে মোবাইলটা বেজে ওঠে। ও দেখছে তাজনূর এর কল। ও ফোনটা ধরে।
হ্যাঁ, বলছি।
ও পাস থেকে বলে, নিবিড়দা, কাজ কেমন চলছে? কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?
আরে না না। সব ঠিকঠাক চলছে।
এখানে খুব কাজের চাপ। তোমাকে সময় মতো ফোন করতে পারিনা। তুমি আছো বলেই আমার ভরসা।
আসবে বলেছিলে?
আসবো।
কবে?
জানাবো। তুমি ভালো তো?
হুম। লালু সব করে।
আচ্ছা। সে জন্যই ওকে তোমার কাছে পাঠালাম। তোমার গাড়ি লাগলে বলবে। অবশ্য তোমার জন্য একটা গাড়ি নেব। তুমি একদিন চলে এসো। তাজনূর ফোন ছেড়ে দেয়।
নিবিড় খুব অবাক হয়। এত কিছু তার জন্য? মিলনটা আবার কি যে ভাবছে কে জানে! ওর কেরামতি। বেটা বেশ আছে ওকে ফাঁসিয়ে।
মনে মনে বলে কথাটা নিবিড়। নদীর ঢেউ এ আজ নেশা আছে। বার বার কথার মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে। ওর তো এমন হবার কথা না। নিবিড় সিগারেটে শেষ টান দিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
নিবিড় আরও কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে। ও ভাবতে থাকে। তাজনূর কেন তাকে নিয়ে এত ভাবছে? এটা কি ও স্বপ্ন দেখছে? তার জন্য নতুন গাড়ি নেবে। সামন্য একটা কাজের মানুষ। এতকিছু! না ওকে অন্য কিছুর দায়িত্ব নিতে হবে? এ সবের উত্তর দিতে পারে মিলন। মিলনের নির্দেশে এ সব ঘটছে। ও ভাবে।
দেখা যাক আরও কিছু দিন। নিবিড় বাঁধের পাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে বসে। মিলনকে একটা ফোন করা দরকার। তাকে বলা প্রয়োজন যে কেন এত কিছু হচ্ছে তার জন্য? বেশ তো আছে। ফোনটা ও বের করে। কিন্তু কি ভাবে ও শুরু করবে? ওর মাথায় কিছু আসছে না। মিলনকে কি বলবে? এটা কি খুব জরুরি? তাজনূর এটা বলেছে তাকে। আর সে কথা তার দাদাকে বলা কি ঠিক হবে?
না তার মাথায় কিছু আসছে না। ও একটা গাধা। সারাজীবন গাধায় থেকে যাবে।
নিবিড় নিজেকে নিজেই ধমকায়। শালা! বোকা হাঁদারাম কোথাকার। চল এখান থেকে।
মনে মনে বলে।
কৃষ্ণচূড়ার ডালে মৌটুসী বসে ডাকছে পিক পিক করে। বেলা গড়িয়ে যায়। এবার তাকে উঠতে হবে। তা না হলে লালু তাকে খুঁজবে। অবশ্য আজ লেবারকে টাকা দেবার দিন নয়। সামনে শনিবার। আজ বুধবার। সপ্তাতে পেমেন্ট। অফিস থেকে সব পাঠিয়ে দেয়। নিবিড় সমস্ত হিসেব অফিসে পাঠিয়ে দেয়। একাউন্টে জমা হয়। হিসেব রাখতে হয় সবের। লালুও তাকে হেল্প করে।
নিবিড় মৌটুসীর ডাক শুনতে শুনতে কাজের সাইটে পা বাড়ায়। নদীর শীতল বাতাসটা আজ খুব মিষ্টি লাগছে। কথা কি কাল আসবে? আজই ও এলো। এর আগে ওকে দেখেনি ও। বার বার কথার মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে। সাধারণ একটি মেয়ে। কিন্তু তার মধ্যে কেমন এক মাদকতা মেশানো। যেন মহুয়া ফুলের গন্ধের মতো। বুকের ভেতর যত যায়, ততবেশি নেশা ধরায়। কথা কি তাই? ও হাঁটতে হাঁটতে ভাবে।
এখানে না এলে কথাকে সে চিনতো না। এই হরিণখেতে আরও যে কি সব অপেক্ষা করছে তার জন্য কে জানে! তবে ও জায়গাটাকে ভালোবাসে ফেলেছে। কখনো কখনো জীবনের বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। তবেই মনে হয় কথাদের চেনা যায়। ভালোবাসা দিয়ে ভাসানো যায়। চেনা গণ্ডি পেরিয়ে সে সব সময় বাঁচতে চেয়েছে। ও বাঁচবে। ওর মতোই ও হাঁটবে। আর এক জীবনের দিকে। ভালোবাসার কাছে।
কমেন্ট করুন